ঈদুল আজহা (কোরবানির ঈদ) ঘিরে প্রতি বছরের মতো এবারও মসলাজাতীয় পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। আগাম প্রস্তুতি হিসেবে ব্যবসায়ীরা বিপুল পরিমাণ মসলা আমদানি করেছেন এবং দেশীয় উৎপাদনও হয়েছে সন্তোষজনক। ফলে বাজার স্থিতিশীল থাকবে—এমন প্রত্যাশাই ছিল সংশ্লিষ্টদের। তবে বাস্তবে পাইকারি ও খুচরা বাজারে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র।
দেশের অন্যতম বড় পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে মসলার দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও খুচরা বাজারে হঠাৎ করেই দাম বেড়ে গেছে। খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি, জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এই দামের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। একই কারণে ঈদের আগে আরও এক দফা দাম বাড়ার আশঙ্কাও করছেন তারা।
বৃহস্পতিবার খাতুনগঞ্জের বিভিন্ন আড়ত ঘুরে জানা যায়, গত দুই মাস ধরে অধিকাংশ মসলার দাম স্থিতিশীল রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই কমে এসেছে। ফলে পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ার তেমন কোনো কারণ নেই।
তবে খুচরা বাজারে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশের বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, পাইকারি ও খুচরা দামের ব্যবধান স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহন খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়ছে ভোক্তা পর্যায়ে।
খাতুনগঞ্জের আড়তদারদের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকেও রাজশাহী, পাবনা ও কুষ্টিয়া থেকে প্রতি ট্রাক পেঁয়াজ চট্টগ্রামে আনতে খরচ পড়ত ২৪ থেকে ২৬ হাজার টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার টাকায়। আগে যেখানে ২৪ ঘণ্টায় পণ্য সরবরাহ সম্ভব ছিল, এখন সময় লাগছে দেড় থেকে দুই দিন। এতে পরিবহন ভাড়া বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
গত এক সপ্তাহে পাইকারি বাজারে পেঁয়াজের দাম কেজিতে ২-৩ টাকা, রসুনে ১০-১২ টাকা এবং ধনিয়ায় ১০-১৫ টাকা বেড়েছে। তবে অধিকাংশ মসলার দাম এখনও নিম্নমুখী রয়েছে। তবুও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পচনশীল ও শুকনো মসলা খুচরা পর্যায়ে বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে।
খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী আলমাস উদ্দিন জানান, পরিবহন খরচ প্রায় দ্বিগুণ হলেও পেঁয়াজের দাম খুব বেশি বাড়েনি—কেজিতে মাত্র ২-৩ টাকা। অনেক ক্ষেত্রে পাইকাররা লোকসানও গুনছেন। তবে খুচরা পর্যায়ে পরিবহন ব্যয়ের প্রভাবেই দাম বাড়ছে। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে কোরবানির ঈদের আগে বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
বৃহস্পতিবার খাতুনগঞ্জে আমদানিকৃত শুকনো মরিচ বিক্রি হয়েছে কেজি ৪০০ টাকায়, যা ১৫ দিন আগে থেকে ৮-১০ টাকা বেশি। পঞ্চগড়ের মরিচ ২৪৫ টাকা এবং আমদানিকৃত ঝাল মরিচ ৩৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। জ্বালানি সংকটের অজুহাতে বিভিন্ন ধরনের মরিচে ৫-৮ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। তবে দেশি হলুদের দাম কমে কেজিতে ২১৮ টাকায় নেমেছে। ধনিয়া ১৩৮-১৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা কেজিতে ১০-১৫ টাকা বেশি। জয়ত্রীর দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২,৮০০ থেকে ২,৯০০ টাকা।
অন্যদিকে পাইকারি বাজারে আমদানিকৃত গরম মসলার মধ্যে জিরা ৫৫০ টাকা, দারুচিনি ৩৫০-৩৫৫, লবঙ্গ ১,৩৩০, গোলমরিচ ১,০২০, এলাচ ৪,০০০-৪,৫০০, জায়ফল ৭০০, কালোজিরা ৩৬০, মেথি ১৩০ এবং সরিষা ৯৪-৯৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
দেশি পেঁয়াজ কেজিতে ২২ থেকে ২৮ টাকায় বিক্রি হলেও নিম্নমানের পেঁয়াজ ৭ থেকে ১৫ টাকায় লেনদেন হচ্ছে। আমদানিকৃত রসুন ১৩০-১৩২, দেশি রসুন ৬৫-৭০ এবং আমদানিকৃত আদা ৯০-৯২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, সাধারণত খাতুনগঞ্জ থেকে আশপাশের এলাকায় কেজিতে ৫-১০ টাকা, ঢাকায় ১২-১৫ টাকা এবং উত্তরাঞ্চলে ১২-১৭ টাকা বেশি দামে পণ্য বিক্রি হয়। কিন্তু বর্তমানে এই ব্যবধান বেড়ে দাঁড়িয়েছে আশপাশে ১২-১৫ টাকা, ঢাকায় প্রায় ২০ টাকা এবং দূরের জেলাগুলোতে ২৫-৩৫ টাকা পর্যন্ত।
খাতুনগঞ্জ ডাল মিল মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি সোলায়মান বাদশা বলেন, ঈদ উপলক্ষে আমদানিকৃত মসলা ইতোমধ্যে বাজারে এসেছে, কিছু পণ্য বন্দরে থাকলেও দ্রুত সরবরাহ হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে এখন দেশের বাজারের দামের তেমন সম্পর্ক নেই। তবে সিন্ডিকেট সক্রিয় হলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে। খুচরা ও পাইকারি দামের ব্যবধান দীর্ঘ হলে পাইকারি বাজারেও দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই বাজার মনিটরিং জোরদারের পরামর্শ দেন তিনি।
ব্যবসায়ীরা আরও জানান, ঢাকার মৌলভীবাজার ও শ্যামবাজার এবং চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ, চাক্তাই, পাহাড়তলী ও রিয়াজউদ্দিন বাজার থেকে সারা দেশে মসলা সরবরাহ হয়। এসব পাইকারি বাজারে দাম স্থিতিশীল থাকলেও পরিবহন খরচ দ্বিগুণ হওয়ায় খুচরা পর্যায়ে কেজিপ্রতি ২ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হচ্ছে। ফলে সারাদেশে গরম ও পচনশীল মসলার দাম ইতোমধ্যেই ঊর্ধ্বমুখী।



