লন্ডনের অভিজাত এলাকায় কোটি কোটি টাকার সম্পদ, আর দেশে বিপুল ঋণখেলাপির দায়—এই বৈপরীত্য ঘিরে আলোচনায় রয়েছেন আম্বার গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওকত আজিজ রাসেল। বিভিন্ন নথি ও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, একদিকে যুক্তরাজ্যে তার বিস্তৃত সম্পদ ও ব্যবসা, অন্যদিকে দেশে ব্যাংকঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার অভিযোগ।
নথিপত্র অনুযায়ী, শওকত আজিজের মালিকানাধীন ‘আম্বার ওভারসিজ লিমিটেড’-এর মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে গড়ে তোলা হয়েছে বাণিজ্যিক ভবন ও বিলাসবহুল আবাসন ব্যবসা। কোম্পানিটি ২০১৩ সালে লন্ডনে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এর শতভাগ মালিকানা তার একার হাতে। প্রতিষ্ঠানটির অফিস ব্রিক লেনে নিবন্ধিত।
অনুসন্ধানে জানা যায়, লন্ডনের অভিজাত এলাকায় ২৭৫ বেথনাল গ্রিন রোডে প্রায় ৮.৫ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের একটি বহুতল ভবনের মালিক তিনি। ভবনটির নিচতলা একটি সুপারশপসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দেওয়া রয়েছে, যেখান থেকে মাসে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভাড়া আসে। এছাড়া ৩৩ চেস্টার ক্লোজ নর্থ রোডে প্রায় ৩ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের আরেকটি আবাসিক বাড়ির মালিকানাও রয়েছে তার, যেখানে আংশিকভাবে তার পরিবার বসবাস করে এবং বাকি অংশ ভাড়া দেওয়া।
এর বাইরে লন্ডনে আরও সম্পদ থাকার তথ্য মিললেও সব নথি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।
শওকত আজিজ রাসেল পারটেক্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা এম এ হাশেমের সন্তান। উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি ‘আম্বার’ অংশের দায়িত্ব পান। পরে তার নেতৃত্বে বস্ত্র, কাগজ, পার্টিকেল বোর্ড, পর্যটনসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণ করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, তার প্রতিষ্ঠিত কিছু কোম্পানি কাগজে থাকলেও বাস্তবে কার্যক্রম নেই।
অনুসন্ধান বলছে, ২০১১ সালের দিকে দেশের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়ার পর সেই অর্থ বিদেশে সরিয়ে নিয়ে লন্ডনে সম্পদ কেনার অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ১ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়, যার একটি বড় অংশ পরিশোধ হয়নি। বর্তমানে তার দায় প্রায় ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে বলে জানা গেছে।
ঋণ খেলাপি হওয়ার পর ব্যাংকগুলোর চাপের মুখে তিনি উচ্চ আদালতে রিট করে একাধিক ঋণের ওপর স্থগিতাদেশ নেন, ফলে পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন আটকে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু স্থগিতাদেশ বাতিল হলেও ব্যাংকগুলো এখনো কার্যকরভাবে অর্থ আদায়ে হিমশিম খাচ্ছে।
গত বছর ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) সংক্রান্ত একটি মামলায় ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগে আদালত তাকে জরিমানা করেন। আদালতের সঙ্গে প্রতারণা ও ব্যাংকের কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার অভিযোগে তারসহ কয়েকজনকে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।
ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আম্বার গ্রুপের ব্যবসার তুলনায় ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেশি হওয়ায় আর্থিক চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে ডেনিম ও কটন মিলগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ায় ঋণের কিস্তি পরিশোধ অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। ফলে গ্রুপটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, বিদেশে অর্থ পাচারের প্রমাণ পাওয়া গেলে স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি টাস্কফোর্সের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, গাজীপুরে ‘ভাওয়াল রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা’ নামের একটি রিসোর্ট নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। বনভূমি ও স্থানীয় জমি দখল করে এটি গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি জেলা প্রশাসনের অভিযানে ওই রিসোর্ট থেকে অবৈধ মদ ও মাদক উদ্ধার করা হয় এবং কয়েকজনকে আটক করা হয়।
এছাড়া বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি হিসেবেও তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দায়িত্ব নিয়েছেন বলে জানা গেছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শওকত আজিজ রাসেলের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা। তার দাবি, শওকত আজিজের বিরুদ্ধে ঋণ বা বিদেশে সম্পদের অভিযোগ সঠিক নয় এবং তিনি কোনো অর্থ পাচার করেননি।
অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি বক্তব্য নেওয়ার জন্য শওকত আজিজ রাসেলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।



